Bengali Romantic Story | অপেক্ষা

এক বিকেলে রোহিণী তার হবু বর প্লাস পাঁচ বছরের পুরনো বয় ফ্রেন্ড আবির এর সাথে গড়ের মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। রোহিণী কী একটা ভাবতে ভাবতে হাতের বাদামের ঠোঙ্গা টা পাশে রেখে আবির এর কাঁধে মাথা রাখলো।

আবির তখন কিছু জরুরী মেসেজে এ ব্যাস্ত ছিল।রোহিণী এবার আবিরের হাতটা জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত অদূরে গলায় বললো,একটা কথা বলবো।আবির অন্যমনস্ক ভাবে বললো ” হু বলো। “

রোহিণী সেইরকম অদূরে গলায় বললো, ” তুমি না বড্ড বেশি নিরস! আমরা এত গুলো দিন প্রেম করলাম অথচ তুমি একদিনও আমাকে প্রপোজ করলেনা। “

আবির একইরকম ভাবে বললো, ” এসব সিনেমা তে হয় বাস্তবে এসব লোক দেখানো ব্যাপার। “

রোহিণী বললো,” হোক লোক দেখানো তাও তুমি আমাকে প্রপোজ করবে এবং সেটা সবার সামনে হাতে গোলাপ নিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে। “

আবির ফিক করে হেসে বললো, ” শারুখ খানের সিনেমা দেখেছো বুঝি! “

রোহিণী মুখ ফুলিয়ে বললো, ” মজা করছো তো!আমি কিন্তু সিরিয়াস। “

আবির ফোন টা পাশে সরিয়ে রেখে রোহিণীর দিকে চাইল।পশ্চিমের ডুবন্ত সূর্যের আলোর ছটা এসে পড়েছে তার অদূরে ফোলানো মুখের ওপর,বেশ মিষ্টি লাগছে দেখতে।

আবির বললো,” তুমি তো জানো রোহিণী,লোক দেখানো ব্যাপার টা আমার পছন্দ নয়,কাউকে না বললে বুঝি ভালোবাসা যায়না, আর আমি সবার সামনে এসব রঙ্গ তামাশা করতে পারবোনা। “

রোহিণীর খুব রাগ হলো,সে আবির এর কাঁধ থেকে মাথাটা তুলে নিয়ে বললো,” কেনো পারবেনা,নিজের হবু বউ কে প্রপোজ করতে কিসের এত লজ্জা তোমার! তোমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত টাই ভুল হয়েছে আমার। “

আবির একটু আঘাত পেয়ে বললো,” এরকম বলোনা প্লিজ,আচ্ছা বেশ রাগ করোনা,কোনো একটা সময় তোমায় নাহোয় প্রপোজ টা করে দেবো, তাহলে হবে তো? “

রোহিণী গনগনে চোখে আবির এর দিকে চাইল, তারপর ব্যাগটা নিয়ে উঠে দাড়িয়ে বললো, ” যতক্ষণ না সবার সামনে দাড়িয়ে আমাকে প্রপোজ করবে ততক্ষণ আমি তোমাকে বিয়ে করবনা ” বলেই সোজা দ্রুত পায়ে সামনে এগিয়ে গেলো।

পেছন থেকে আবির এর টুকরো টুকরো কথা ভেসে আসছে, রোহিণী দাড়াও….. কোথায় যাচ্ছ……রোহিণী………. রোহিণী কোনো কথা কানে নিয়ে বড়ো রাস্তার দিকে এগিয়ে গেলো,আস্তে আস্তে আবিরের গলাটা বিকেলের শহরের ব্যাস্ত রাস্তায় যান্ত্রিক আওয়াজের নিচে ঢাকা পরে গেলো।

রোহিণীর রাগ সহজে কমেনা, মেয়েরা সব মেনে নেবে কিন্তু ভালোবাসায় আঘাত কিছুতেই সহ্য হয়না।খুব ছোটো একটা জিনিস চেয়েছিল আবিরের কাছে আর আবির কি না এভাবে মজা করলো!রোহিণীর চোখে জল এসে গেল।বাড়ি গিয়েও কারোর সাথে ভালো করে কথা অব্দি বলেনি। একবার ফোন করুক ভালো করে গায়ের ঝাল না ঝাড়া অব্দি রোহিণী কারোর সাথে কথা বলবেনা খাবেওনা।

কিন্তু কোথায় ফোন!সারা সন্ধ্যাতেও আবির এর একটিও ফোন এলোনা। রোহিণীর অভিমান জমে জমে পাহাড় হয়ে গেছে,একটা সময় সে ঘুমিয়ে পড়লো।আজ ঠিক রাত বারোটায় রোহিণীর জন্মদিন,আবির নিশ্চয় কিছু সারপ্রাইজ দেবে তাই এখন ফোন করছেনা।রাতে ফোন করলে তখন সব রাগ পুষিয়ে নিতে হবে। আবিরের কোনো কথাতেই ভুললে চলবে না।

রাত বারোটার কাটা রোহিণীর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে গেছে অনেকক্ষণ কিন্তু কেউ ওকে ফোন করেনি।রোহিণীর ইনবক্স এ শুভেচ্ছা বার্তা উপচে পড়েছে কিন্তু কোথাও আবিরের একটুকরো মেসেজ অব্দি নেই।

সকালে ঘুম ভেঙে রোহিণীর মাথাটা খারাপ হয়ে গেলো,আবির আজ অব্দি কোনদিন তার জন্মদিন টা মিস করেনি। আজ তবে কী হলো!রোহিণীর মনে হলো আবির ইচ্ছে করে কালকের ঘটনার বদলা নেওয়ার জন্য এরকম করছে, আবির চায় রোহিণী প্রথম ফোন টা করুক। রাগে রোহিণীর কান লাল হয়ে গেল।করবেনা সে ফোন কিছুতেই। বন্ধ ঘরের মধ্যে সে ছট্ফট করতে লাগলো,এক একটা সময় খুব ভারী মনে হচ্ছে তার। ফোনে সামান্য কোনো আওয়াজ হলেই ফিরে ফিরে দেখছে,এই বুঝি আবিরের ফোন এলো। কিন্তু অপেক্ষার সেই ফোন এলোনা।

কাল রাত থেকে সে কিছু খায়নি,সকালে অবশ্য মা এসে জোর করে খাইয়ে গেছে,আবির এর সাথে যে তার ঝগড়া হয়েছে সেটা মা ভালই জানে অথচ কিছুই বললোনা। বেশ কিছুটা সময় কাটার পর রোহিণীর মনে হলো আবিরের কোনো বিপদ হলোনা তো,ভয়ে বুকটা কেপে উঠলো।যাঃ কিসব বাজে চিন্তা,বিপদ কেনো হবে আর হলে কি তাকে কেউ কোনো খবর দিতনা। তাও সে তার আর আবিরের কমন ফ্রেণ্ড তিয়াসা কে ফোন করলো, ওকে সবটা খুলে বলার পর অনেকটা হাল্কা মনে হলো।

তিয়াসা বললো,” তুই নিশ্চিন্তে থাক আবির এর কিছুই হয়নি সকালেই আমার সাথে কথা বলেছে। আমার মনে হয় ও তোর ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়।তুই একদম ফোন করবিনা, ওর শাস্তি হওয়া উচিত। “

ফোন টা রেখে রোহিণী আর নিজেকে সামলাতে পারলনা, কান্নায় ভেঙে পড়লো,একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে আবির এরকম করবে ভাবতেই পারেনি। আবির এর সাথে হয়তো বিয়েটা আর হবেনা, বাড়িতে জানতে হবে,সবাই খুব কষ্ট পাবে কিন্তু সত্যি টা তো বলতেই হবে।

বিকালে তিয়াসা ফোন করে বললো,” মন খারাপ করিসনা, আমার বাড়িতে চলে আয়,একা একা কিছু সিদ্ধান্ত নিতে যাসনা, এখানে সবাই আছে কিছু একটা ঠিক করা যাবে, তাছাড়া তোর জন্মদিনের সেলিব্রেশন টাও তো বাকি আছে। “

রোহিণীর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছিলনা কিন্তু তিয়াসা অনেক বলার পর রাজি হয় গেলো। সত্যি বাড়িতে বসে দম বন্ধ হয়ে আসছে। তিয়াসা দের বাড়িটা বিশাল বড়ো,বাড়ির গেটে একজন দারোয়ান থাকে সে রোহিণী কে দেখে একটু হেসে গেট খুলে দিল।রোহিণী বাড়ির ভেতরে গিয়ে অবাক হয়ে গেল,সবে সন্ধ্যে হয়েছে, তিয়াসা জানে রোহিণী আসবে তাও চারিদিকে এত অন্ধকার কেনো করে রেখেছে। রোহিণী ভয়ে ভয়ে ডাকলো ‘ তিয়াসা…’ কারোর কোনো উত্তর নেই।

রোহিণী ভাবছে আবার ফিরে যাবে নাকি একটা ফোন করবে এমনসময় হঠাৎ একটা ফ্ল্যাশ লাইট জ্বলে উঠলো তার ওপরে।রোহিণী তার কেন্দ্র বিন্দুতে দাড়িয়ে।রোহিণী এত অবাক হয়ে গিয়েছিল যে কোনো কথাই বলতে পারলোনা। চমকটা কাটিয়ে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই তার সামনে আর একটা ফ্ল্যাশ লাইট জ্বলে উঠল,তার কেন্দ্র বিন্দুতে দাড়িয়ে আছে আবির,রোহিণী হা করে সেদিকে চেয়ে আছে।

আবির নাটকীয় ভাবে ডান হাতের গোলাপ টা পিছন থেকে সামনে নিয়ে এলো তারপর হাঁটু মুড়ে বসে বললো, ‘ আই লাভ ইউ রোহিণী, উইল ইউ ম্যারি মি প্লিজ ‘ সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে লাইট জ্বলে উঠলো, তিয়াসা দের বাড়িটা হাত তালিতে মুখরিত হয়ে উঠলো।রোহিণী হা করে চেয়ে রইলো , প্রথমে বুঝতেই পারলনা কি হচ্ছে।যখন বুঝতে পারল তখন লজ্জায় তার মুখ লাল হযে গেছে,আবির ঠিকই বলেছিল এত লোকের সামনে না বলাই ভালো ছিল, আবির টা যে কী করে…. একদম যাঃ তা!!!

Leave a Comment

Pin It on Pinterest

Share This